একটা সময় ছিল যখন জীবনযাত্রার মান বলতে কেবল অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়াকেই বোঝানো হতো। তবে একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে উন্নত বিশ্বে বাসযোগ্যতার সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। এখন মৌলিক চাহিদার গণ্ডি পেরিয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পরিবেশের মান এবং নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দেশগুলোর এই মানদণ্ড বা সূচক নির্ণয় করে থাকে। এর মধ্যে বৈশ্বিক ডেটাবেস ‘নাম্বিও’ (Numbeo) তাদের জীবনযাত্রার মানসূচকে মূলত নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবার মান, জীবনযাত্রার খরচ, আবাসন কেনার সামর্থ্য, যানজট, দূষণ এবং জলবায়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যৌথভাবে বিবেচনা করে থাকে।
নাম্বিও-এর সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের জীবনযাত্রার মান সূচকে (Quality of Life Index) এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছে কাতার। আগের বছরের তুলনায় এক লাফে ৬ ধাপ এগিয়ে বৈশ্বিক তালিকায় দ্বাদশ (১২তম) স্থানে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের এই শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তি। এর ফলে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষ ১৫টি দেশের তালিকায় যেমন কাতার নিজের অবস্থান পোক্ত করেছে, তেমনি এশিয়া এবং উপসাগরীয় (জিসিসি) অঞ্চলের মধ্যে দ্বিতীয় শীর্ষ বাসযোগ্য দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে।
কাতারের জাতীয় পরিকল্পনা পরিষদ এই ঐতিহাসিক অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, দেশের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান সূচকের স্কোর ১৮২ দশমিক ৭ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে এবার ১৮৮ দশমিক ৬-এ দাঁড়িয়েছে। টেকসই অবকাঠামো, আধুনিক ও উন্নত জনসেবা, বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা, শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা এবং নিটোল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নেরই এক জীবন্ত প্রতিফলন এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি।
বিশ্বমঞ্চে কাতার: পেছনে পড়ল পশ্চিমা পরাশক্তিরা
নাম্বিও-এর ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী এই তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডস, যার স্কোর ২০৫ দশমিক ৬। এর পরবর্তী শীর্ষ স্থানগুলোতে পর্যায়ক্রমে রয়েছে লুক্সেমবার্গ, ওমান, ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ড।
তবে এবারের সূচকের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আলোচিত বিষয় হলো কাতারের দুর্দান্ত উত্থান। ১৮৮ দশমিক ৬ স্কোর নিয়ে কাতার ঐতিহ্যগতভাবে শীর্ষ বাসযোগ্য হিসেবে পরিচিত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ সুইডেন (১৮৭.৬)-কে টপকে গেছে। শুধু সুইডেনই নয়, জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে কাতার এখন অস্ট্রেলিয়া (১৮৬.৮), নিউজিল্যান্ড (১৮৬.২), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৮৪.৭) এবং স্পেন (১৮৩.৪)-এর মতো পশ্চিমা পরাশক্তি ও উন্নত দেশগুলোর চেয়েও এগিয়ে রয়েছে। বৈশ্বিক তালিকার আরও নিচে অবস্থান করছে যুক্তরাজ্য (১৭৩.৮) ও ফ্রান্স (১৭২.৬)।
এক দশক আগেও যারা মরুভূমির এই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, তাদের জন্য কাতার এবং ওমানের এই বৈশ্বিক অবস্থান একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত জবাব বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা।
কাতারের মূল শক্তি যেখানে
নাম্বিও সূচকের চুলচেরা উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাতার মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্য যেকোনো উন্নত দেশের চেয়ে ঢের এগিয়ে রয়েছে:
-
উচ্চ ক্রয়ক্ষমতা (Purchasing Power): কাতারের ক্রয়ক্ষমতার স্কোর ১৭৩.৫, যা বৈশ্বিক স্তরে অন্যতম সর্বোচ্চ। এই অঞ্চলে কেবল প্রতিবেশী কুয়েত (১৭৯.৭) কাতারের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে। এখানকার বাসিন্দাদের উপার্জিত রিয়ালের মান ও অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থা বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের মুদ্রার চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ।
-
অনন্য নিরাপত্তা স্কোর (Safety): কাতারের অন্যতম বড় শক্তির জায়গা এর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ৮৪.৮ স্কোর নিয়ে কাতার বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। এই সূচকে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাত (৮৬.৩) কাতারের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে।
-
সহজলভ্য আবাসন (Property Affordability): ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার জনবহুল ও উন্নত রাজধানীগুলোর তুলনায় দোহায় আবাসন বা ফ্ল্যাট কেনা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বেশি সহজলভ্য। কাতারের সম্পত্তি মূল্য ও আয়ের অনুপাত (Property Price-to-Income Ratio) মাত্র ৪.৫, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোতে এই অনুপাত নিয়মিতভাবে দুই অঙ্কের ঘরে (Double Digit) অবস্থান করে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের (GCC) দেশগুলোর মধ্যে ওমান ২০৩.৯ স্কোর নিয়ে বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় শীর্ষস্থান দখল করে এই অঞ্চলের নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। ওমানের ঠিক পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কাতার। অন্যদিকে, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৬৮.৫), কুয়েত (১৫৮.৬) এবং সৌদি আরব (১৫৪.৫) জীবনযাত্রার মানে কাতারের চেয়ে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১২টি দেশের মধ্যে দুটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন কেবল জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি বা তেল-গ্যাস বিক্রির কাগুজে অর্থনীতির পেছনে ছুটছে না, বরং নাগরিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত মানোন্নয়নকেই সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্র: তবে এই অনন্য অর্জনের পরও কাতারের জন্য আগামীতে আরও উন্নতির পথ খোলা রয়েছে। তীব্র গ্রীষ্মকালীন জলবায়ু এবং মরু অঞ্চলের দূষণ সংক্রান্ত প্রাকৃতিক উপাদানগুলো কাতারের সামগ্রিক স্কোরের ওপর কিছুটা নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করেছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাতার সরকার যদি বর্তমানে চলমান তাদের পরিবেশগত সবুজ প্রকল্প ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর কর্মসূচিগুলো আরও জোরদার করে, তবে আগামী দিনে বৈশ্বিক শীর্ষ ১০টি দেশের ভেতরে কাতারের স্থান পাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।

