১ নভেম্বর ২০২৬

কাতারের ঐতিহাসিক স্থান আল জুবারাহ: অতীতের সমৃদ্ধ এক জনপদ

প্রকাশ: শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬
কাতারের ঐতিহাসিক স্থান আল জুবারাহ: অতীতের সমৃদ্ধ এক জনপদ
টপ স্টোরিজ

কাতারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল শামালের উপকূলে অবস্থিত 'আল জুবারাহ' (Al Zubarah) দেশটির অন্যতম প্রাচীন, সমৃদ্ধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ঐতিহাসিক স্থান।

রাজধানী দোহা থেকে প্রায় ১০৫ কিলোমিটার (৬৫ মাইল) দূরে অবস্থিত এই ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদটি বিংশ শতাব্দীতে তেল ও গ্যাস আবিষ্কারের আগের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নগর জীবনের এক জীবন্ত দলিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কুয়েত থেকে আগত বনি উতবাহ (Bani Utbah) গোত্রীয় কনফেডারেশনের হাত ধরে শহরটির পত্তন ঘটে। দীর্ঘ ইতিহাসের নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থান-পতন পেরিয়ে ২০১৩ সালে ঐতিহ্যবাহী এই প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটটিকে ইউনেস্কো (UNESCO) মর্যাদাপূর্ণ 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট' বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ভৌগোলিক অবস্থান ও নামকরণের নেপথ্য

আরবি শব্দ 'জুবারাহ' এর অর্থ দাঁড়ায় উঁচুতে অবস্থিত বালুর ঢিবি বা ছোট আকারের পাহাড়ি টিলা। সমুদ্র সমতল থেকে সামান্য উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুসারেই এলাকাটির নাম রাখা হয় 'আল জুবারাহ'। উপকূলীয় এলাকায় এই উঁচু অবস্থান তৎকালীন সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দূর থেকে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও চমৎকার কৌশলগত সুবিধা দিতে সহায়তা করত।

পারস্য উপসাগরের পশ্চিম বাহু ও হরমুজ প্রণালীর মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত হওয়ায় আল জুবারাহ খুব দ্রুতই আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং মুক্তা আহরণের এক বিশ্বখ্যাত মূলকেন্দ্রে পরিণত হয়।

বাণিজ্যিক বিস্তার ও উন্নত নগর জীবন

অষ্টাদশ শতাব্দীর ষাটের দশকে বনি উতবাহ গোত্রের স্থায়ী বসতি স্থাপনের পর প্রাকৃতিক বন্দরের সুবাদে শহরটি পারস্য উপসাগরের প্রধান বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে ওঠে। ভারত, ওমান, ইরাক ও কুয়েতের সাথে এর সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। মুক্তা ও খেজুর রপ্তানির পাশাপাশি মশলা এবং বিভিন্ন ধাতু আমদানির প্রধান কেন্দ্র ছিল এই বন্দর। পরবর্তী সময়ে বাহরাইন জয়ের মাধ্যমে এর বাণিজ্যিক পরিধি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে দেখা যায়, আল জুবারাহর রাস্তাঘাট সুনির্দিষ্ট 'গ্রিড প্যাটার্নে' সমকোণে বিন্যস্ত ছিল, যা তৎকালীন সময়ে উন্নত নগর পরিকল্পনার এক অনন্য নিদর্শন। শহরের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ সময়ে ৬,০০০ থেকে ৯,০০০ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। অধিবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন আবর্তিত হতো কেন্দ্রীয় 'সউক' বা বাজারকে কেন্দ্র করে। খননকাজে প্রাপ্ত তামাকের পাইপ এবং চীন থেকে আমদানিকৃত কফি পটের অবশিষ্টাংশ সেকালের ধনাঢ্য ও মার্জিত সংস্কৃতি প্রকাশ করে।

সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সম্পদ সুরক্ষায় শহরটির চারপাশে জোড়া প্রতিরক্ষামূলক প্রাচীর, সমুদ্র খাল এবং দুর্গ গড়ে তোলা হয়। এদের মধ্যে 'কালাত মুরাইর' (Qal'at Murair) এবং ১৯৩৮ সালে নির্মিত ঐতিহাসিক 'আল জুবারাহ দুর্গ' (Al Zubara Fort) এই অঞ্চলের সামরিক স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে আজ অব্দি টিকে আছে।

ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও ৩টি বিশেষ মানদণ্ড (Selection Criteria)

১৮১১ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পর শহরটির সিংহভাগ এলাকা মরুভূমির বালুর নিচে ঢাকা পড়ে অটুট অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে। ইউনেস্কো প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে একে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে:

  1. মানদণ্ড (iii) - মুক্তা বাণিজ্যের বিরল স্মারক: সমগ্র আরব বিশ্বে অক্ষত অবস্থায় টিকে থাকা প্রাচীন মুক্তা-বণিক শহরের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ নগর রূপরেখা হলো আল জুবারাহ। এটি আদি ইসলামিক যুগ থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত গড়ে ওঠা সামুদ্রিক ও মুক্তা ব্যবসার চূড়ান্ত রূপ ফুটিয়ে তোলে।
  2. মানদণ্ড (iv) - রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মানচিত্র পুনর্লিখন: অটোমান, ইউরোপীয় ও পারস্য সাম্রাজ্যের আওতার বাইরে গিয়ে যেসব ছোট স্বাধীন রাজ্য গড়ে উঠেছিল এবং যার মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে আধুনিক উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, জুবারাহ তারই এক ঐতিহাসিক সাক্ষী।
  3. মানদণ্ড (v) - মরুর প্রতিকূলতায় জীবনসংগ্রাম: ডুবুরিদের সীসার ওজন, সিরামিক, প্রাচীন কাঠের জাহাজের (Dhow) চিত্রকর্ম, মাছের ফাঁদ ও কূপ থেকে প্রমাণিত হয় যে—অধিবাসীরা কীভাবে মরুর প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সমুদ্রের রূপালী সম্পদকে সমন্বিত করেছিল।

বর্তমান স্থায়িত্ব ও সংরক্ষণ আইনি ব্যবস্থা

প্রায় ৪০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই সাইটটি সুরক্ষায় কাতার সরকার ১৯৮০ সালের ২ নম্বর এবং ২০১০ সালের ২৩ নম্বর সংশোধিত পুরাকীর্তি আইনের অধীনে আইনি প্রতিরক্ষা জোরদার করেছে।

কাতার ন্যাশনাল মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, জুবারাহর আশপাশের 'বাফার জোনে' কোনো প্রকার বাণিজ্যিক বা রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন প্রকল্প পুরোপুরি নিষিদ্ধ। 'আল রিম বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ'-এর অন্তর্ভুক্ত এই এলাকাটির প্রাচীরগুলোর ক্ষয় রোধ ও প্রাকৃতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে 'কাতার মিউজিয়ামস অথরিটি' এবং কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে 'কাতার ইসলামিক আর্কিওলজি অ্যান্ড হেরিটেজ' প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বমানের সংরক্ষণমূলক কাজ পরিচালনা করে আসছে।

আল জুবারাহ কেবল কাতারের অতীত ইতিহাস নয়, বরং গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার এক জীবন্ত ইতিহাস।

আরও পড়ুন

কাতারে মাঠে গড়াচ্ছে এশিয়া কাপ রাইজিং স্টার্স: বাংলাদেশের খেলা কবে কোথায়

প্রকাশ: রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
কাতারে মাঠে গড়াচ্ছে এশিয়া কাপ রাইজিং স্টার্স: বাংলাদেশের খেলা কবে কোথায়
টপ স্টোরিজ

আগামী ১৯ নভেম্বর শুরু হতে যাচ্ছে এশিয়া কাপ রাইজিং স্টার্স। ভেন্যু এবার কাতারে, এরই মধ্যে এসিসি টুর্নামেন্টের সূচি প্রকাশ করেছে।

একই গ্রুপে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। কাতারের ওয়েস্ট এন্ড ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও ইউনিভার্সিটি অব দোহা ফর সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ক্রিকেট মাঠে হবে এবারের এশিয়া কাপ রাইজিং স্টার্স।

'এ' গ্রুপে বাংলাদেশ 'এ' দল, শ্রীলঙ্কা 'এ' দল, আফগানিস্তান 'এ' দল এবং হংকং দল। এ ছাড়া 'বি' গ্রুপে থাকছে ভারত 'এ' দল, পাকিস্তান 'এ' দল এবং নেপাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জাতীয় দল। এই টুর্নামেন্টের ফরম্যাট ৫০ ওভারের।

১৯ নভেম্বর প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হংকং। দ্বিতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কা লড়বে আফগানিস্তানের বিপক্ষে।

২০ নভেম্বর পাকিস্তান-ইউএই ও ভারত-নেপাল ম্যাচ। পরদিন শ্রীলঙ্কা-হংকং ও বাংলাদেশ-আফগানিস্তান লড়াই।

২২ তারিখ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ছাড়াও রয়েছে ইউএই-নেপাল ম্যাচ।

২৩ নভেম্বর আফগানিস্তান-হংকং এবং শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ ম্যাচ এবং ২৪ নভেম্বর ভারত-ইউএই ও পাকিস্তান-নেপাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।

২৬ নভেম্বর ও ২৭ নভেম্বর দুটি সেমিফাইনাল এবং ২৯ নভেম্বর ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।

২ থেকে ৭ নভেম্বর দোহায় শুরু হচ্ছে প্যাডেল বিশ্বকাপ!

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
২ থেকে ৭ নভেম্বর দোহায় শুরু হচ্ছে প্যাডেল বিশ্বকাপ!
টপ স্টোরিজ

আন্তর্জাতিক প্যাডেল ফেডারেশন (FIP)-এর অন্যতম প্রধান আসর 'এফআইপি প্যাডেল বিশ্বকাপ কাতার ২০২৬' আয়োজনের জন্য সার্বিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে দোহা।

আগামী ২ থেকে ৭ নভেম্বর রাজধানী দোহার খলিফা ইন্টারন্যাশনাল টেনিস অ্যান্ড স্কোয়াশ কমপ্লেক্সে জমকালো এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে কাতার প্যাডেল ফেডারেশন (QPF) টুর্নামেন্ট শুরুর এই চূড়ান্ত প্রস্তুতির কথা নিশ্চিত করেছে।

এবারের বিশ্বকাপে বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় ৩২টি জাতীয় দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এর মধ্যে পুরুষ বিভাগে ১৬টি এবং নারী বিভাগে ১৬টি দল অংশ নেবে।

২০২১ ও ২০২৪ সালের সফল আয়োজনের পর এবার তৃতীয়বারের মতো এই বিশ্বমঞ্চের আয়োজন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে কাতারের উচ্চমানের পেশাদারিত্ব এবং একটি বৈশ্বিক স্পোর্টস হাব হিসেবে দোহার অবস্থানকে আরও শক্ত ভিত্তি প্রদান করল।

কাতার টেনিস, স্কোয়াশ ও ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের (QTSBF) মহাসচিব এবং টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর তারিক দরবেশ জয়নাল কাতার নিউজ এজেন্সি (QNA)-কে জানিয়েছেন যে, টুর্নামেন্টের লজিস্টিকস, কোর্ট ব্যবস্থাপনা ও টেকনিক্যালসহ সার্বিক অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, কাতার জাতীয় দল সম্প্রতি জাপানে অনুষ্ঠিত আইচি-নাগোয়া ২০২৬ এশিয়ান গেমসে ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক জয় নিশ্চিত করায় এবার স্বাগতিক কাতার দলের প্রতি সমর্থকদের প্রত্যাশা আরও অনেক উঁচুতে। র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ১০-এ থাকা কাতার দল ঘরের মাঠে সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিতে আশাবাদী।

টুর্নামেন্টের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাদ আল-মোহান্নাদি জানান, অনলাইন টিকিট প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে যাতে দেশি-বিদেশি দর্শকরা সহজেই খেলা উপভোগ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক প্যাডেল ফেডারেশন কাতারের ওপর আস্থা রেখে ২০২৬ এবং ২০২৮ সালের দুটি বিশ্বকাপ আয়োজন তুলে দেওয়ায় এটিকে বিশ্ব ক্রীড়া সংস্থার বিশেষ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে দোহা।

অংশগ্রহণকারী চূড়ান্ত দল ও বাছাইপর্ব:

ইতোমধ্যে পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগে ১৫টি করে মোট ৩০টি দেশ সরাসরি মূল পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছে।

  • পুরুষ বিভাগ: স্বাগতিক কাতার, বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল, ফ্রান্স, চিলি, সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি।

  • নারী বিভাগ: স্বাগতিক কাতার, স্পেন, আর্জেন্টিনা, ইতালি, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ফ্রান্স, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে, চিলি, জার্মানি ও গ্রেট ব্রিটেন।

উভয় বিভাগের মূল লড়াইয়ের চূড়ান্ত ১৬তম দলটি নির্ধারণে আগামী ২৬ থেকে ৩০ অক্টোবর কুয়েতে যৌথ আফ্রিকা-এশিয়া বাছাইপর্বের খেলা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে শীর্ষ স্থান অর্জনকারী দল দুটি দোহায় অনুষ্ঠিত মূল পর্বের চূড়ান্ত ড্র-তে যুক্ত হবে।

গোল করে বিদায় নিলেন আরেক আর্জেন্টাইন বিশ্বজয়ী

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ০৮, ২০২৬
গোল করে বিদায় নিলেন আরেক আর্জেন্টাইন বিশ্বজয়ী
টপ স্টোরিজ

বুয়েনস অ্যাইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার রাতে ফুটবল বিশ্ব দেখেছে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৮ বছর বয়সে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখা লিওনেল মেসির বিদায়।

৮৫ হাজারেরও বেশি দর্শকের উন্মাদনা, আতশবাজির ঝলকানি এবং পুরো বিশ্ব মিডিয়ার স্পটলাইট সবই ছিল মহাতারকা মেসিকে ঘিরে। তবে ৮৫ হাজার দর্শকের গগনবিদারি করতালির আড়ালেই জাতীয় দলের নীল-সাদা জার্সি চিরতরে তুলে রাখলেন আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের অন্যতম সেনাপতি ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপজয়ী নিকোলাস ওতামেন্দি।

বেনিনের বিরুদ্ধে ৩-০ গোলের জয়ের রাতে মেসি যখন মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, ঠিক তখনই অন্তরালে নিজের ১৭ বছরের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন এই বর্ষীয়ান ডিফেন্ডার।

ম্যাচের ৪৮তম মিনিটে ফুটবল বিশ্বকে দারুণ এক দৃশ্য উপহার দেন ওতামেন্দি।

মেসির নেওয়া নিখুঁত কর্নার থেকে অসাধারণ এক অ্যাক্রোবেটিক ভলিতে বেনিনের জালে বল জড়িয়ে দেন তিনি। গোল করার পর উল্লাসে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন দীর্ঘদিনের বন্ধু মেসিকে। বিদায়ি ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে গোল করার মতো বিরল স্মৃতি নিয়ে মাঠ ছাড়েন এই তারকা।

ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত ওতামেন্দি বলেন, ‘অবিশ্বাস্য এক সমাপ্তি! আমি তো আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলাম।

কিন্তু আমাদের অধিনায়কের (মেসি) বিশেষ আমন্ত্রণে আবার এখানে এসে তার এই ঐতিহাসিক ক্ষণের অংশ হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। জাতীয় দলের হয়ে ১৭ বছরে আমি কত কী পেয়েছি! আর শেষ ম্যাচে গোল করার অনুভূতি আমি সারা জীবন মনে রাখব।’

ম্যাচের ৫২তম মিনিটে যখন তাকে তুলে নেওয়া হয়, তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভেসে যায় করতালিতে। মাঠ ছাড়ার আগে আর্জেন্টিনার ব্যাজে চুমু খেয়ে সমর্থকদের রাজকীয় অভিবাদন গ্রহণ করেন ওতামেন্দি। ডাগআউটে ফেরার পথে কৃতজ্ঞতা জানান সতীর্থ মেসির প্রতি, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিনয়ী মানুষ হওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

আর্জেন্টাইন পতাকাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তোমার কাছে আমরা ঋণী।’

২০০৯ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হওয়া নিকোলাস ওতামেন্দি দীর্ঘ ১৭ বছরে খেলেছেন ১৪০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। রক্ষণে দেয়াল তুলে দাঁড়ানোর পাশাপাশি করেছেন ১০টি গোল। আর্জেন্টিনার আধুনিক ফুটবলের সোনালি যুগের অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। দেশের হয়ে জিতেছেন চারটি বড় শিরোপা—২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা।

বিদায়ের রাতে আকাশে ড্রোনে ক্যারিয়ারের গল্প, আবেগে ভাসলেন মেসি

প্রকাশ: বুধবার, অক্টোবর ০৭, ২০২৬
বিদায়ের রাতে আকাশে ড্রোনে ক্যারিয়ারের গল্প, আবেগে ভাসলেন মেসি
টপ স্টোরিজ

আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলেছেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় লিখে ফেলার পরই কিংবদন্তিকে ঘিরে তৈরি হলো আরও একটি আবেগঘন মুহূর্ত। মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের আকাশে ড্রোন শোতে ফুটে উঠল আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির বর্ণিল ক্যারিয়ারের স্মরণীয় সব মুহূর্ত।

ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনার সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে দাঁড়িয়ে সেই বিশেষ আয়োজন দেখেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। আকাশে একের পর এক ড্রোনের আলোয় ফুটে উঠতে থাকে জাতীয় দলের হয়ে তার সেরা মুহূর্তগুলো। মেসির করা দুর্দান্ত কিছু গোলের দৃশ্যও তুলে ধরা হয় সেই আয়োজনে।

বিদায় লিওনেল মেসি, শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতলো ৩-০ গোলে

তবে সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যগুলোর একটি ছিল ২০২২ বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর ট্রফিতে চুমু খাচ্ছেন মেসি, ড্রোনের আলোয় আকাশে ফুটে ওঠে সেই ছবিও।

সতীর্থদের মাঝে দাঁড়িয়ে মেসিকে পুরো আয়োজনজুড়েই আবেগাপ্লুত ও আপ্লুত দেখাচ্ছিল। যে জার্সিতে একসময় স্বপ্ন পূরণের লড়াই শুরু করেছিলেন, সেই আর্জেন্টিনার হয়েই শেষ ম্যাচের পর আকাশে তার পুরো ক্যারিয়ারের স্মৃতি তুলে ধরা ছিল যেন এক কিংবদন্তিকে বিদায়ের অনন্য আয়োজন।

বেনিনের বিপক্ষে জয় দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেও মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার গল্প শেষ হওয়ার নয়। বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকা, অসংখ্য গোল আর কোটি মানুষের ভালোবাসা সবকিছুর স্মৃতি নিয়েই জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন ফুটবলের এই মহাতারকা।

মেসির বিদায়ী ম্যাচের আগে ক্ষমা ও নিজের শাস্তি চেয়ে রোনালদোর পোস্ট

বিদায় লিওনেল মেসি, শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতলো ৩-০ গোলে

প্রকাশ: বুধবার, অক্টোবর ০৭, ২০২৬
বিদায় লিওনেল মেসি, শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতলো ৩-০ গোলে
টপ স্টোরিজ

লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচটা স্মরণীয় করে রাখল আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলতে নেমে অধিনায়ক মেসি নিজে গোল করার পাশাপাশি একটি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। তার দল বেনিনকে হারিয়েছে ৩-০ গোলে।

প্রথমার্ধে একাধিক সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। বিরতির পর অবশ্য দ্রুতই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই নিকোলাস ওতামেন্দির গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। পরে নিকো পাজের গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ হয়। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে শেষ পর্যন্ত নিজেও স্কোরশিটে নাম লেখান মেসি।

প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা একাধিকবার বেনিনের গোলমুখে আক্রমণ করেছে। মেসি নিজেও কয়েকটি সুযোগ পেয়েছিলেন। তার দুটি শট লক্ষ্যেও ছিল, কিন্তু বেনিনের গোলরক্ষক মার্সেল দান্দজিনু তা ঠেকিয়ে দেন।

৪৩ মিনিটে মেসির থ্রু বল থেকে দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন জুলিয়ান আলভারেজ। তবে তার শটও বেনিনের গোলরক্ষকের দুর্দান্ত সেভে আটকে যায়।

যে বল দিয়ে শেষ ম্যাচ খেলছেন মেসি, লেখা ‘দ্য লাস্ট ড্যান্স’

অন্যদিকে বেনিনও কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল। এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে কয়েকবার পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে প্রথম ৪৫ মিনিটে দুই দলই গোল করতে ব্যর্থ হয়। ফলে গোলশূন্য অবস্থায় শেষ হয় প্রথমার্ধ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় আর্জেন্টিনা। ৪৮ মিনিটে কর্নার থেকে মেসির ক্রসে খুব কাছ থেকে ডান পায়ের শটে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। তার শট গোলের ওপরের মাঝামাঝি দিয়ে জালে জড়ায়। মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে আসা এই গোলেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

৬০ মিনিটে মেসি আবারও বেনিনের গোলরক্ষককে পরীক্ষা করেন। বক্সের বাইরে থেকে তার বাঁ পায়ের শট ওপরের ডান কোণ লক্ষ্য করে যাচ্ছিল। কিন্তু মার্সেল দান্দজিনু সেটিও ঠেকিয়ে দেন। এর এক মিনিট পর অবশ্য আর ঠেকাতে পারেননি তিনি।

শেষ অনুশীলনের ছবি শেয়ার করে ভক্তদের মনে দোলা দিয়েছেন মেসি

৬১ মিনিটে নিকো পাজ বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে বল পাঠান নিচের বাঁ কোণে। আর সেই গোলের পেছনে ছিলেন মেসি। তার অ্যাসিস্ট থেকেই গোলটি করেন পাজ। ফলে আর্জেন্টিনার লিড বেড়ে দাঁড়ায় ২-০।

এই গোলের পরই মেসিকে তুলে নিয়ে নিকো পাজকে মাঠে নামান স্কালোনি। রদ্রিগো দে পলের জায়গাতেও নিকো পাজ নামেন।

৬৮ মিনিটে আর্জেন্টিনা পায় পেনাল্টি। আগুস্তিন গিয়াইকে বেনিনের টামিমু উওরোর ফাউলের কারণে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। ৭০ মিনিটে ইনজুরির কারণে কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকে। এরপর ৭১ মিনিটে স্পটকিক নিতে এগিয়ে আসেন মেসি।

বাঁ পায়ের শটে বল পাঠান গোলের ওপরের ডান কোণে। বেনিনের গোলরক্ষককে কোনো সুযোগই দেননি তিনি। গোলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের বিদায়ী ম্যাচে মেসির নামও উঠে যায় স্কোরশিটে। স্কোরলাইন তখন আর্জেন্টিনা ৩, বেনিন ০।

৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনা দলে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়। ৫৯ মিনিটে রদ্রিগো দে পলের পরিবর্তে নিকো পাজ মাঠে নামেন। ৬০ মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজকে তুলে নিকোলাস গনসালেসকে খেলানো হয়।

৭৮ মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের বদলে লিওনেল ফ্লোরেস মাঠে নামেন। পরের মিনিটে এনজো ফার্নান্দেসের জায়গায় এক্সেকিয়েল পালাসিওস, ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর বদলে ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুনো এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের জায়গায় জিওভানি লো সেলসো মাঠে নামেন।

বেনিনও দ্বিতীয়ার্ধে কয়েকটি পরিবর্তন আনে। ৬৪ মিনিটে জুনিয়র ওলাইতান ও ইয়ামিরু উওরুকে তুলে যথাক্রমে মাত্তেও আহলিনভি ও জুনিয়র ওলুগবাদেকে নামানো হয়। ৭৫ মিনিটে তসিন আইয়েগুন ও টামিমু উওরুর জায়গায় মাঠে নামেন জোডেল দোসু ও শার্লেমাগন আজংনিতোদে। ৭৬ মিনিটে গোলরক্ষক মার্সেল দান্দজিনুর জায়গায় আসেন স্যাতুর্নিন আলাগবে।

মেসি গোল করার পরও আক্রমণ চালিয়ে গেছেন। ৭৫ মিনিটে নিকো গনসালেসের ক্রস থেকে বক্সের মাঝামাঝি জায়গা থেকে ডান পায়ের শট নেন মেসি। তবে বল বাঁ পাশ দিয়ে বাইরে চলে যায়।

৮৩ ও ৮৮ মিনিটে মেসি অফসাইডে ধরা পড়েন। ৮৯ মিনিটে জিওভানি লো সেলসোর সহায়তায় বক্সের মাঝ থেকে আবারও শট নেন তিনি। এবারও বেনিনের গোলরক্ষক স্যাতুর্নিন আলাগবে নিচের বাঁ কোণে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল ঠেকিয়ে দেন। একই মিনিটে মেসির থ্রু বল থেকে লিওনেল ফ্লোরেসও গোলের চেষ্টা করেন। তার শটও ঠেকিয়ে দেন আলাগবে।

নির্ধারিত সময়ের পর যোগ করা সময়ে মেসি আরও একটি ফ্রি-কিক পান। ৯৩ মিনিটে ফাউলের শিকার হয়ে আর্জেন্টিনা ফ্রি-কিক পায়। ৯৫ মিনিটে ম্যাচের শেষ সুযোগগুলোর একটিতে সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে বাঁ পায়ের শট নেন মেসি। তবে বল গোলপোস্টের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। এরপরই শেষ বাঁশি বাজে।

শেষ পর্যন্ত বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচে নিকোলাস ওতামেন্দি গোল করে শুরুটা করে দেন, নিকো পাজ ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এবং পেনাল্টি থেকে তৃতীয় গোলটি করেন মেসি। মেসির নামের পাশে থাকল এক গোল ও একটি অ্যাসিস্ট।

জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচে অধিনায়কের এমন পারফরম্যান্সে আবেগঘন বিদায় আরও বিশেষ হয়ে উঠল। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনাও মেসির শেষ ম্যাচটি শেষ করল জয়ের হাসি নিয়ে।

তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর এস্টাডিও মনুমেন্টালে বিউগলের করুন সুরের সঙ্গে মেসি ভক্তদের হৃদয় ভেঙে কান্না নেমে আসে। রাতের আঁধার ভেদ করে বুয়েন্স আয়ার্সের আকাশে লেজার লাইটের মাধ্যমে ভেসে ওঠে মেসির বিদায়ী দৃশ্য। তার ১০ নাম্বার জার্সি ও বিদয়ী বার্তা।