পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন নোয়াখালীর আব্দুল বাসেত। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান।
গত বছরের আগস্টে দেশে আসে তার মরদেহ। নিয়ম অনুযায়ী চলতি বছরের শুরুতেই ১০ লাখ টাকার বীমা দাবির আবেদন করেন মা জাকিয়া বেগম। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সে অর্থের দেখা মেলেনি। এখন পরিবারের ভরসা শুধু বড় ছেলের ছোট্ট চায়ের দোকান। সে আয়ে কোনো রকমে চলছে সংসার। ছোট ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে নেয়া ঋণ এখনো শোধ হয়নি।
জাকিয়া বেগমের মতো এমন হাজারো পরিবার বীমার অর্থের অপেক্ষায় দিন গুনছে। কেবল নিহত প্রবাসীদের পরিবারই নয়, বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া অনেক কর্মীও চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য বীমা সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে আয় হারানোর ধাক্কায় অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
এ পরিস্থিতির জন্য মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে শুধু প্রবাসীদের কল্যাণই ব্যাহত হচ্ছে না, ক্ষুণ্ন হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাও।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬২ প্রবাসী কর্মী এ বীমা কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়াম হিসেবে বোর্ড জীবন বীমা করপোরেশনকে পরিশোধ করেছে ৪৮৮ কোটি ৫২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৪০ টাকা। অথচ গত এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রিমিয়ামের বিপরীতে বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৫৬ দশমিক ১১ শতাংশ।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মৃত, অঙ্গহানির শিকার ও দেশে ফিরে আসা ২ হাজার ১০০ প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের প্রায় ৬৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার বীমা দাবি এখনো বকেয়া। অন্যদিকে জীবন বীমা করপোরেশনের দাবি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কাছে তাদের ২২ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রিমিয়াম আটকে আছে। এ বকেয়া অর্থকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জীবন বীমা করপোরেশনকে নতুন প্রিমিয়াম পরিশোধ বন্ধ রাখে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের টানাপড়েনে আটকে যায় হাজারো প্রবাসী পরিবারের প্রাপ্য অর্থ।
বিদেশগামী সব কর্মীর জন্য বীমা সুবিধা এখন বাধ্যতামূলক। এ লক্ষ্যে ২০২৩ সালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং জীবন বীমা করপোরেশনের মধ্যে নতুন চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১৮-৫৫ বছর বয়সী যেকোনো বিদেশগামী কর্মী এককালীন ১ হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি বীমা সুবিধার আওতায় আসতে পারেন। আর কর্মীদের কাছ থেকে সংগৃহীত এ প্রিমিয়াম ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সরাসরি জীবন বীমা করপোরেশনকে দিয়ে থাকে।
বীমা সুবিধার আওতায় আসা কারো মৃত্যু কিংবা দুর্ঘটনায় সম্পূর্ণ স্থায়ী অক্ষমতা বা পঙ্গুত্ব বরণ করলে পরিবারকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান। আংশিক অক্ষমতার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত হারে অর্থ দেয়া হয়। এছাড়া বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া কর্মীদের জন্যও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বীমা কার্যক্রম থেকে অর্জিত লভ্যাংশও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে ভাগাভাগি করার কথা।
বীমা দাবি পরিশোধে বিলম্বের পেছনে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সফটওয়্যার ও ডেটা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। জীবন বীমা করপোরেশনের দাবি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড নতুন এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) সফটওয়্যার চালু করলেও সেটির সঙ্গে জেবিসির সিস্টেম সমন্বিত হয়নি। ফলে ৫৬ কোটি টাকার বেশি দাবির নথিতে দীর্ঘদিনের ব্যাকলগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বোর্ডের কাছে ২২ কোটির বেশি টাকার প্রিমিয়ামও বকেয়া রয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের সংশোধিত চুক্তিতে বীমার মেয়াদ দুই বছর থেকে পাঁচ বছরে উন্নীত করা এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করায় আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলেও দাবি করছে জীবন বীমা করপোরেশন। তাদের হিসাবে, বর্তমান ধারায় চলতে থাকলে চুক্তির মেয়াদ শেষে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকায়।
জীবন বীমা করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ ও হিসাব বিভাগ) মোহাম্মদ আবু কাউছার জলিল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কল্যাণ বোর্ড তাদের সিস্টেম আপডেট করে জানায় যে আর হার্ডকপি পাঠাবে না; তাদের নতুন সফটওয়্যার এমআইএস ইন্টারফেস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এ কমিউনিকেশন ও সিস্টেম রূপান্তরের কারণে ৪৪ কোটি টাকার একটি ব্যাকলক বা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল, যা জেবিসি পরবর্তী সময়ে ডেটা ডাউনলোড করে সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কল্যাণ বোর্ড দাবি করছে যে তাদের এমআইএস সফটওয়্যারে তথ্য এন্ট্রি করার দায় জেবিসির। এটিকে”অন্যায্য উল্লেখ করে চিঠি দিয়ে কল্যাণ বোর্ডকে জানানো হয়েছে, তাদের কর্মীরাই এতে তথ্য এন্ট্রি দেবে। এর দায় জীবন বীমা করপোরেশনের নয়। আমাদের কাছে যেভাবে বীমা দাবি আসবে সেটি যাচাই করে কল্যাণ বোর্ডের অর্থ পরিশোধ করে দেব।’
দুই প্রতিষ্ঠানের পাল্টাপাল্টি দাবি-দাওয়ার মাঝখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবার, যাদের জন্যই এ বীমা কর্মসূচি চালু হয়েছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে কেউ মারা গেছেন, কেউ দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার কেউ কাজ হারিয়ে ফিরেছেন দেশে। অথচ সংকটের সময় যে আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল, তা পেতে তাদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জীবন বীমার কাছে কিছু টাকা পেন্ডিং আছে, সেটি আমরা খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারব। সফটওয়্যারজনিত জটিলতা নিয়েও কাজ করছি, এ সপ্তাহেই সমাধান হয়ে যাবে আশা করছি। আমরা নিয়মিত জীবন বীমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, তাদেরও কিছু অর্থ পেন্ডিং আছে। এটা খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারব আশা করি।’