২৭ জুলাই ২০২৬

সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের টানাটানি: বীমার টাকা পাচ্ছেন না প্রবাসীরা

প্রকাশ: সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬
সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের টানাটানি: বীমার টাকা পাচ্ছেন না প্রবাসীরা

পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন নোয়াখালীর আব্দুল বাসেত। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান।

গত বছরের আগস্টে দেশে আসে তার মরদেহ। নিয়ম অনুযায়ী চলতি বছরের শুরুতেই ১০ লাখ টাকার বীমা দাবির আবেদন করেন মা জাকিয়া বেগম। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সে অর্থের দেখা মেলেনি। এখন পরিবারের ভরসা শুধু বড় ছেলের ছোট্ট চায়ের দোকান। সে আয়ে কোনো রকমে চলছে সংসার। ছোট ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে নেয়া ঋণ এখনো শোধ হয়নি।

জাকিয়া বেগমের মতো এমন হাজারো পরিবার বীমার অর্থের অপেক্ষায় দিন গুনছে। কেবল নিহত প্রবাসীদের পরিবারই নয়, বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া অনেক কর্মীও চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য বীমা সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে আয় হারানোর ধাক্কায় অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।

এ পরিস্থিতির জন্য মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে শুধু প্রবাসীদের কল্যাণই ব্যাহত হচ্ছে না, ক্ষুণ্ন হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাও।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬২ প্রবাসী কর্মী এ বীমা কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়াম হিসেবে বোর্ড জীবন বীমা করপোরেশনকে পরিশোধ করেছে ৪৮৮ কোটি ৫২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৪০ টাকা। অথচ গত এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রিমিয়ামের বিপরীতে বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৫৬ দশমিক ১১ শতাংশ।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মৃত, অঙ্গহানির শিকার ও দেশে ফিরে আসা ২ হাজার ১০০ প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের প্রায় ৬৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার বীমা দাবি এখনো বকেয়া। অন্যদিকে জীবন বীমা করপোরেশনের দাবি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কাছে তাদের ২২ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রিমিয়াম আটকে আছে। এ বকেয়া অর্থকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জীবন বীমা করপোরেশনকে নতুন প্রিমিয়াম পরিশোধ বন্ধ রাখে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের টানাপড়েনে আটকে যায় হাজারো প্রবাসী পরিবারের প্রাপ্য অর্থ।

বিদেশগামী সব কর্মীর জন্য বীমা সুবিধা এখন বাধ্যতামূলক। এ লক্ষ্যে ২০২৩ সালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং জীবন বীমা করপোরেশনের মধ্যে নতুন চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১৮-৫৫ বছর বয়সী যেকোনো বিদেশগামী কর্মী এককালীন ১ হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি বীমা সুবিধার আওতায় আসতে পারেন। আর কর্মীদের কাছ থেকে সংগৃহীত এ প্রিমিয়াম ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সরাসরি জীবন বীমা করপোরেশনকে দিয়ে থাকে।

বীমা সুবিধার আওতায় আসা কারো মৃত্যু কিংবা দুর্ঘটনায় সম্পূর্ণ স্থায়ী অক্ষমতা বা পঙ্গুত্ব বরণ করলে পরিবারকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান। আংশিক অক্ষমতার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত হারে অর্থ দেয়া হয়। এছাড়া বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া কর্মীদের জন্যও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বীমা কার্যক্রম থেকে অর্জিত লভ্যাংশও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে ভাগাভাগি করার কথা।

বীমা দাবি পরিশোধে বিলম্বের পেছনে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সফটওয়্যার ও ডেটা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। জীবন বীমা করপোরেশনের দাবি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড নতুন এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) সফটওয়্যার চালু করলেও সেটির সঙ্গে জেবিসির সিস্টেম সমন্বিত হয়নি। ফলে ৫৬ কোটি টাকার বেশি দাবির নথিতে দীর্ঘদিনের ব্যাকলগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বোর্ডের কাছে ২২ কোটির বেশি টাকার প্রিমিয়ামও বকেয়া রয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

অন্যদিকে, ২০২৩ সালের সংশোধিত চুক্তিতে বীমার মেয়াদ দুই বছর থেকে পাঁচ বছরে উন্নীত করা এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করায় আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলেও দাবি করছে জীবন বীমা করপোরেশন। তাদের হিসাবে, বর্তমান ধারায় চলতে থাকলে চুক্তির মেয়াদ শেষে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকায়।

জীবন বীমা করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ ও হিসাব বিভাগ) মোহাম্মদ আবু কাউছার জলিল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কল্যাণ বোর্ড তাদের সিস্টেম আপডেট করে জানায় যে আর হার্ডকপি পাঠাবে না; তাদের নতুন সফটওয়্যার এমআইএস ইন্টারফেস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এ কমিউনিকেশন ও সিস্টেম রূপান্তরের কারণে ৪৪ কোটি টাকার একটি ব্যাকলক বা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল, যা জেবিসি পরবর্তী সময়ে ডেটা ডাউনলোড করে সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কল্যাণ বোর্ড দাবি করছে যে তাদের এমআইএস সফটওয়্যারে তথ্য এন্ট্রি করার দায় জেবিসির। এটিকে”অন্যায্য উল্লেখ করে চিঠি দিয়ে কল্যাণ বোর্ডকে জানানো হয়েছে, তাদের কর্মীরাই এতে তথ্য এন্ট্রি দেবে। এর দায় জীবন বীমা করপোরেশনের নয়। আমাদের কাছে যেভাবে বীমা দাবি আসবে সেটি যাচাই করে কল্যাণ বোর্ডের অর্থ পরিশোধ করে দেব।’

দুই প্রতিষ্ঠানের পাল্টাপাল্টি দাবি-দাওয়ার মাঝখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবার, যাদের জন্যই এ বীমা কর্মসূচি চালু হয়েছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে কেউ মারা গেছেন, কেউ দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার কেউ কাজ হারিয়ে ফিরেছেন দেশে। অথচ সংকটের সময় যে আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল, তা পেতে তাদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জীবন বীমার কাছে কিছু টাকা পেন্ডিং আছে, সেটি আমরা খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারব। সফটওয়্যারজনিত জটিলতা নিয়েও কাজ করছি, এ সপ্তাহেই সমাধান হয়ে যাবে আশা করছি। আমরা নিয়মিত জীবন বীমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, তাদেরও কিছু অর্থ পেন্ডিং আছে। এটা খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারব আশা করি।’

সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের টানাটানি: বীমার টাকা পাচ্ছেন না প্রবাসীরা

প্রকাশ: সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬
সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের টানাটানি: বীমার টাকা পাচ্ছেন না প্রবাসীরা

পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন নোয়াখালীর আব্দুল বাসেত। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান।

গত বছরের আগস্টে দেশে আসে তার মরদেহ। নিয়ম অনুযায়ী চলতি বছরের শুরুতেই ১০ লাখ টাকার বীমা দাবির আবেদন করেন মা জাকিয়া বেগম। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সে অর্থের দেখা মেলেনি। এখন পরিবারের ভরসা শুধু বড় ছেলের ছোট্ট চায়ের দোকান। সে আয়ে কোনো রকমে চলছে সংসার। ছোট ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে নেয়া ঋণ এখনো শোধ হয়নি।

জাকিয়া বেগমের মতো এমন হাজারো পরিবার বীমার অর্থের অপেক্ষায় দিন গুনছে। কেবল নিহত প্রবাসীদের পরিবারই নয়, বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া অনেক কর্মীও চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য বীমা সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে আয় হারানোর ধাক্কায় অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।

এ পরিস্থিতির জন্য মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে শুধু প্রবাসীদের কল্যাণই ব্যাহত হচ্ছে না, ক্ষুণ্ন হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাও।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬২ প্রবাসী কর্মী এ বীমা কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়াম হিসেবে বোর্ড জীবন বীমা করপোরেশনকে পরিশোধ করেছে ৪৮৮ কোটি ৫২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৪০ টাকা। অথচ গত এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রিমিয়ামের বিপরীতে বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৫৬ দশমিক ১১ শতাংশ।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মৃত, অঙ্গহানির শিকার ও দেশে ফিরে আসা ২ হাজার ১০০ প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের প্রায় ৬৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার বীমা দাবি এখনো বকেয়া। অন্যদিকে জীবন বীমা করপোরেশনের দাবি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কাছে তাদের ২২ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রিমিয়াম আটকে আছে। এ বকেয়া অর্থকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জীবন বীমা করপোরেশনকে নতুন প্রিমিয়াম পরিশোধ বন্ধ রাখে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের টানাপড়েনে আটকে যায় হাজারো প্রবাসী পরিবারের প্রাপ্য অর্থ।

বিদেশগামী সব কর্মীর জন্য বীমা সুবিধা এখন বাধ্যতামূলক। এ লক্ষ্যে ২০২৩ সালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং জীবন বীমা করপোরেশনের মধ্যে নতুন চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১৮-৫৫ বছর বয়সী যেকোনো বিদেশগামী কর্মী এককালীন ১ হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি বীমা সুবিধার আওতায় আসতে পারেন। আর কর্মীদের কাছ থেকে সংগৃহীত এ প্রিমিয়াম ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সরাসরি জীবন বীমা করপোরেশনকে দিয়ে থাকে।

বীমা সুবিধার আওতায় আসা কারো মৃত্যু কিংবা দুর্ঘটনায় সম্পূর্ণ স্থায়ী অক্ষমতা বা পঙ্গুত্ব বরণ করলে পরিবারকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান। আংশিক অক্ষমতার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত হারে অর্থ দেয়া হয়। এছাড়া বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া কর্মীদের জন্যও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বীমা কার্যক্রম থেকে অর্জিত লভ্যাংশও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে ভাগাভাগি করার কথা।

বীমা দাবি পরিশোধে বিলম্বের পেছনে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সফটওয়্যার ও ডেটা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। জীবন বীমা করপোরেশনের দাবি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড নতুন এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) সফটওয়্যার চালু করলেও সেটির সঙ্গে জেবিসির সিস্টেম সমন্বিত হয়নি। ফলে ৫৬ কোটি টাকার বেশি দাবির নথিতে দীর্ঘদিনের ব্যাকলগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বোর্ডের কাছে ২২ কোটির বেশি টাকার প্রিমিয়ামও বকেয়া রয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

অন্যদিকে, ২০২৩ সালের সংশোধিত চুক্তিতে বীমার মেয়াদ দুই বছর থেকে পাঁচ বছরে উন্নীত করা এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করায় আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলেও দাবি করছে জীবন বীমা করপোরেশন। তাদের হিসাবে, বর্তমান ধারায় চলতে থাকলে চুক্তির মেয়াদ শেষে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকায়।

জীবন বীমা করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ ও হিসাব বিভাগ) মোহাম্মদ আবু কাউছার জলিল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কল্যাণ বোর্ড তাদের সিস্টেম আপডেট করে জানায় যে আর হার্ডকপি পাঠাবে না; তাদের নতুন সফটওয়্যার এমআইএস ইন্টারফেস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এ কমিউনিকেশন ও সিস্টেম রূপান্তরের কারণে ৪৪ কোটি টাকার একটি ব্যাকলক বা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল, যা জেবিসি পরবর্তী সময়ে ডেটা ডাউনলোড করে সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কল্যাণ বোর্ড দাবি করছে যে তাদের এমআইএস সফটওয়্যারে তথ্য এন্ট্রি করার দায় জেবিসির। এটিকে”অন্যায্য উল্লেখ করে চিঠি দিয়ে কল্যাণ বোর্ডকে জানানো হয়েছে, তাদের কর্মীরাই এতে তথ্য এন্ট্রি দেবে। এর দায় জীবন বীমা করপোরেশনের নয়। আমাদের কাছে যেভাবে বীমা দাবি আসবে সেটি যাচাই করে কল্যাণ বোর্ডের অর্থ পরিশোধ করে দেব।’

দুই প্রতিষ্ঠানের পাল্টাপাল্টি দাবি-দাওয়ার মাঝখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবার, যাদের জন্যই এ বীমা কর্মসূচি চালু হয়েছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে কেউ মারা গেছেন, কেউ দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার কেউ কাজ হারিয়ে ফিরেছেন দেশে। অথচ সংকটের সময় যে আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল, তা পেতে তাদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জীবন বীমার কাছে কিছু টাকা পেন্ডিং আছে, সেটি আমরা খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারব। সফটওয়্যারজনিত জটিলতা নিয়েও কাজ করছি, এ সপ্তাহেই সমাধান হয়ে যাবে আশা করছি। আমরা নিয়মিত জীবন বীমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, তাদেরও কিছু অর্থ পেন্ডিং আছে। এটা খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারব আশা করি।’

আমিরাতে বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতা কামনা প্রতিমন্ত্রীর

প্রকাশ: সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬
আমিরাতে বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতা কামনা প্রতিমন্ত্রীর

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রদূত।

রবিবার সাক্ষাতে তারা বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের সম্মুখীন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি এসব সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতা কামনা করেন।

তিনি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের কল্যাণ ও বৈধ স্বার্থ সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রতিমন্ত্রী পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে ২০২৬ সালের মধ্যে ঢাকায় দ্বিতীয় বাংলাদেশ–সংযুক্ত আরব আমিরাত যৌথ কনস্যুলার কমিটির সভা আয়োজনের আগ্রহ ব্যক্ত করেন।

তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এ সভায় কনস্যুলার ও অভিবাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং এ ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব পর্যালোচনা করা হয়। উভয় পক্ষ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

তারা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেন, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলবে।

এছাড়া, উভয় পক্ষ বাংলাদেশ–সংযুক্ত আরব আমিরাত জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল সক্রিয় করার এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে এর সভা আয়োজনের বিষয়ে একমত হন।

ইউএই রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির অধিবেশনে ওয়াদি উরাইয়াহ ন্যাশনাল পার্ককে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের মূল্যবান সহযোগিতার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

উভয় পক্ষ দুই বন্ধুপ্রতিম দেশ ও জনগণের পারস্পরিক কল্যাণে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বকে আরও গভীর ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন।

বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি: দাবি বেবিচকের

প্রকাশ: রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি: দাবি বেবিচকের

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রকল্পের সব ব্যয় যথাযথ সরকারি অনুমোদন এবং চুক্তির শর্ত মেনেই করা হয়েছে।

শনিবার এক বিবৃতিতে বেবিচক বলেছে, সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয়, ভেরিয়েশন ওয়ার্ক, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা খণ্ডিত ও প্রেক্ষাপটবিহীন। এসব তথ্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

বেবিচক বলছে, প্রায় দুই বছর আগে তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হলেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হয়েছে। এর কারণ ছিল পরিচালনাগত প্রস্তুতি, কারিগরি পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সময়।

এসব প্রস্তুতির কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকার ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

অনুমোদন ছাড়াই ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগের বিষয়ে বেবিচক বলেছে, এ দাবি 'তথ্যগতভাবে ভুল'। ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকার মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ২০১৭ সালের অক্টোবরে অনুমোদন পায়। পরে আন্তর্জাতিক দরপত্র মূল্যায়নের পর ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার সংশোধিত ডিপিপি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সরকার অনুমোদন দেয়।

এরপর দ্বিতীয়বার সংশোধিত ডিপিপি ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশন অনুমোদন দেয়। যেখানে মোট ব্যয় ধরা হয় ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা এবং ভেরিয়েশন ওয়ার্কের জন্য ৩ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা।

এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি, প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ২০ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা অনুমোদিত ব্যয়সীমার মধ্যেই রয়েছে।

সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ব্যবহৃত গাছপালা অতিরিক্ত দামে কেনার অভিযোগও অস্বীকার করেছে বেবিচক। সংস্থাটির দাবি, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে নির্ধারিত একক দর অনুযায়ীই সব অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। চুক্তিতে প্রায় ১৪ হাজার ৮২৪টি বিল অব কোয়ান্টিটি (বিওকিউ) আইটেম রয়েছে এবং সামগ্রিক চুক্তি থেকে আলাদা করে কোনো একটি আইটেমের মূল্যায়ন করা যায় না।

পুকুর উন্নয়ন, মাটি অপসারণ, কোভিড-১৯ মহামারির সময় ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে দেওয়া অর্থ এবং ভেরিয়েশন ওয়ার্কে অনিয়মের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে বেবিচক। সংস্থাটি জানায়, এসব কাজ ফিডিক চুক্তির আওতায় সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রকল্পের আন্তর্জাতিক প্রকৌশল পরামর্শক এনওসিডি জেভি তা অনুমোদন করেছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদনও নেওয়া হয়েছে।

বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের যে আপত্তি তুলেছে, সে বিষয়ে বেবিচক বলেছে, সরকারি প্রকল্পে নিরীক্ষা আপত্তি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ নয়।

সংস্থাটি আরও জানায়, মন্ত্রণালয় গঠিত সমঝোতা কমিটি ইতোমধ্যে প্রকল্প ব্যয় থেকে ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাকি অডিট আপত্তিগুলোর জবাবও প্রস্তুত করা হচ্ছে।

এদিকে, বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কথিত ভুয়া ভেরিয়েশন ওয়ার্কে কারা অনুমোদন দিয়েছেন, অনিয়মের মাধ্যমে কত অর্থ আত্মসাৎ বা অপচয় হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত ছিলেন—সব বিষয়ই সরকার খতিয়ে দেখবে।

প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে কোনো ধরনের সমঝোতার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, 'যেই জড়িত থাকুক না কেন, আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক সুবিধা পেল বাংলাদেশ

প্রকাশ: শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক সুবিধা পেল বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্যিক শুল্ক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কহার পেয়েছে। এর ফলে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডসহ প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আরও শক্তিশালী হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ১৯৭৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যাক্টের ৩০১ ধারার আওতায় জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত শেষে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) বিশ্বের ৮৬টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ৬০টি অর্থনীতির জন্য নতুন শুল্কহার ঘোষণা করেছে।

২৩ জুলাই ঘোষিত এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ ওয়াশিংটন সময় রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারার আওতায় পূর্বে আরোপিত অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলো।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বিদ্যমান মোস্ট ফেভার্ড নেশন (এমএফএন) শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ৮৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৭টি দেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কস্তরে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশও এ তালিকায় থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানি বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে। ফলে এসব দেশের তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে, ইউএসটিআর বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ) চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও বস্ত্র উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০১ ধারার অতিরিক্ত শুল্ক মওকুফ করা হতে পারে।

এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আরও একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রাখা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলোর টেকসই প্রবৃদ্ধি, নীতিমালা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ সরকার।

স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই ৩৮.৬% বাংলাদেশির: জাতিসংঘ

প্রকাশ: শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই ৩৮.৬% বাংলাদেশির: জাতিসংঘ

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিসহ পাঁচটি সহযোগী সংস্থার এক যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার এক উদ্বেগজনক তথ্য।

‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬' শীর্ষক এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৩৮.৬ শতাংশ মানুষেরই স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই।

সাধ্যের বাইরে থাকা উচ্চমূল্যের কারণে দেশের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুজন পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালে দেশের প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ এই মারাত্মক আর্থিক ও পুষ্টিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন।

প্রতিবেদনে উল্লিখিত 'হেলদি ডায়েট বাস্কেট' (স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার) মূলে রয়েছে দৈনন্দিন মাথাপিছু অন্তত ২ হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরির সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা। এর আওতায় শর্করা, প্রাণিজ আমিষ, শাকসবজি, ফলমূল, শুঁটি জাতীয় উদ্ভিদ, বাদাম ও তেল-চর্বির মতো ছয়টি মৌলিক খাদ্যগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কেবল পেট ভরানো নয়, বরং শরীরের সঠিক বিকাশ ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখার জন্য এসব উপাদানের উপস্থিতি অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োজনীয় এই খাদ্যতালিকা জোগাড় করা দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জন্য কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

কেবল বাংলাদেশেই নয়, খাদ্য নিরাপত্তার এই বৈশ্বিক সংকট পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই দৃশ্যমান। এ অঞ্চলে পাকিস্তানের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক, যেখানে প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার ক্ষমতা নেই। পাকিস্তানের পরপরই দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সংকটের বিচারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খারাপ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২.৬৯ বিলিয়ন বা ৩২.৭ শতাংশ মানুষ সুষম খাবার জোগাড় করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, যার মধ্যে আফ্রিকায় এই হার সর্বোচ্চ ৬৬.৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের অযৌক্তিক ও আকাশছোঁয়া দামই এই সংকটকে নিয়মিত উসকে দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. রুহুল আমিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ, মাংস এবং ফলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ এগুলো খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে।

তাছাড়া বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে দ্রুত তা কার্যকর হলেও বিশ্ববাজারে দাম কমার সুফল স্থানীয় ভোক্তারা সহজে পান না। ফলে সাধারণ মানুষের আয় সামান্য বাড়লেও স্বাস্থ্যকর খাবার কেনা তাদের নাগালের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যানে তাকালে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে দেশে স্বাস্থ্যকর খাবারের দৈনিক খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশে একজন মানুষের জন্য প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড়ের গড় খরচ ২০১৭ সালে যেখানে ৩.০৯ ডলার পিপিপি বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা ছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪.৫৯ ডলারে পৌঁছেছে।

খরচের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে মূলত প্রাণিজ আমিষ, ফলমূল এবং শাকসবজি কিনতে, আর শর্করাজাতীয় খাবারে ব্যয় হচ্ছে তুলনামূলক কম। এ অঞ্চলে খরচের বিচারে ভুটান ও শ্রীলঙ্কার পরই বাংলাদেশের অবস্থান হলেও পাকিস্তানে স্বাস্থ্যকর খাবারের সার্বিক খরচ মাত্র ৩.৯৪ ডলার।

অবশ্য এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যেও আশার একটি আলো খুঁজে পাওয়া গেছে পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারার সক্ষমতার সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে। ২০১৭ সালে যেখানে বাংলাদেশের প্রায় ৬২.৮ শতাংশ অর্থাৎ ১০ কোটি ১৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারতেন না, ২০২৫ সালে সেই হার কমে ৩৮.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত বছরগুলোতে খাবারের দাম বৃদ্ধির হারের চেয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য বাবদ বরাদ্দের আয় কিছুটা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই সামর্থ্যহীন মানুষের মোট সংখ্যায় এই ইতিবাচক পতন সম্ভব হয়েছে।

বৈশ্বিক পরিসরেও স্বাস্থ্যকর খাবারের গড় খরচ সাম্প্রতিক সময়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী দৈনিক সুষম খাবারের গড় খরচ ২.৯৪ ডলার থাকলেও ২০২১ সালে তা বেড়ে ৩.৪৪ ডলার এবং ২০২৫ সালে এসে দাঁড়ায় ৪.২৮ ডলারে।

বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই দৈনন্দিন খরচ ৪.৯১ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। তবে এই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির পরও বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে না পারা মানুষের মোট সংখ্যা ২.৯৭ বিলিয়ন থেকে কিছুটা কমে ২.৬৯ বিলিয়নে নেমে এসেছে, যা কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পুষ্টিকর খাবারকে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে নিয়ে আসতে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে দ্রুত খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো এবং উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ার যাবতীয় খরচ কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।

একই সাথে পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত সংসংরক্ষণাগার নির্মাণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতির সার্বিক উন্নয়ন, নিখুঁত বাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং খাদ্যের যেকোনো ধরণের অপচয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।