মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই তার হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাকে উদযাপন করেন। এমনকি গণমাধ্যমের সামনে বেশ বীরদর্পে তুলে ধরেন সেসব ঘটনা। তার মতে, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তার এ কৌশলগত অনিশ্চয়তাই মিত্র ও শত্রু উভয় পক্ষকে সবসময় তটস্থ রাখে। আজ থেকে ১৩ মাস আগে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোয় হামলা কিংবা জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনতে ডেল্টা ফোর্স পাঠানোর মতো ঘটনাগুলো ছিল তারই উদাহরণ। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে তার আগের প্রেসিডেন্টরা হাজারবার চিন্তা করতেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অপরিসীম ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এখন তার হাতে। আর এর একমাত্র সীমা হলো ‘নিজের নৈতিকতা’।
তবে সম্প্রতি সেই ট্রাম্পকেই দেখা যাচ্ছে চরম কোণঠাসা ও অসহায় অবস্থায়। এমন এক যুদ্ধে তিনি আটকে পড়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দ্রুত থামিয়ে দেয়া এবং দেশটির সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে যখন ট্রাম্প পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করেন, তখন তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি, তার ক্ষমতার সীমানা কতটা সংকীর্ণ হতে পারে। প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, টানা পাঁচ মাস ধরে যুদ্ধ চলার পরও সেই উদ্দেশ্যগুলোর একটিও অর্জিত হয়নি।
একসময় নিজের শক্তিতে অন্ধ ট্রাম্প নিশ্চিত ছিলেন, তেহরানেও তিনি ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ বাস্তবায়ন করতে পারবেন। অর্থাৎ সামরিক বলপ্রয়োগ করে ওয়াশিংটনের অনুগত সরকার বসাবেন। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তেহরানে সে কৌশল খাটবে না। ফলে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়তে এক রকম দ্বিধায় ভুগছেন তিনি।
এদিকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম কিংবা শেয়ারবাজারের পতন থামাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ জলপথও এখন একই রকম ঝুঁকির মুখে। ইরান যেখান থেকে তেল রফতানি করে, সেই ‘খার্গ দ্বীপ’ বা তাদের ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার দখলের হুমকি দিলেও প্রকাশ্যে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, সেখানে পদাতিক বা স্থলসেনা পাঠানোর মানসিকতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা বলছেন, ক্ষমতার এ সীমাবদ্ধতা ট্রাম্পকে গভীরভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। ফলে দিন দিন তার মেজাজ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন জ্বালানি সচিব সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক শক্তিসংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এটি ছিল দীর্ঘ ১৮ মাসের আলোচনার ফসল। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তা উড়িয়ে দেন। তিনি হঠাৎ ঘোষণা করেন, সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিয়ে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে এ চুক্তি বাতিল।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে অভিজ্ঞ সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, ট্রাম্প তার এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আবারও সৌদি আরবকে দূরে ঠেলে দিলেন এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে উল্লাস করার সুযোগ করে দিলেন। সেই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে যাওয়া যে শুধু বোকামি এবং তা শেষ পর্যন্ত প্রতারণায় রূপ নেবে—ইরানকে সেই বয়ান জোরদার করার শক্তিশালী সুযোগ করে দিলেন তিনি।
একইভাবে কানাডার সঙ্গে সীমান্ত সংযোগকারী সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ‘গর্ডি হাওই আন্তর্জাতিক সেতু’ চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে কানাডীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। এটি তার নিজের আমলে সই হওয়া ইউএসএমসিএ বাণিজ্য চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর জেরে কানাডা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে মার্কিন প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ বাতিল করে। এমনকি নিজ দলের আবাসন সংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় বিলেও সই করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ক্যাপিটাল হিলের রিপাবলিকানদের চরম বিপাকে ফেলে দেন তিনি।
ইপসোস ও ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৯ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় সন্তুষ্ট। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক স্পিকার মাইক জনসনও প্রকাশ্যে বলেছেন, আমাদের এখন এ যুদ্ধের ইতি টানা উচিৎ।
কিন্তু সম্মানজনকভাবে বের হয়ে আসার কোনো পথ ট্রাম্পের সামনে খোলা নেই। এক মাস আগে প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে তাড়াহুড়ো করে ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করে তিনি জয়ের ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই চুক্তি টিকেছে মাত্র দুই সপ্তাহ।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, এবং জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে মূলত তিনটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও, প্রতিটি পথই ট্রাম্পের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
এক. সামরিক উত্তেজনা বাড়ানো: সপ্তাহজুড়ে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়ার পরও গত শুক্রবার আকস্মিকভাবে পিছু হটেন ট্রাম্প। বিভিন্ন সামরিক পর্যালোচনার উদ্ধৃতি দিয়ে একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা বা ইরানের সুরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধূলিসাৎ করার জন্য ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালালেও তেহরান কার্যকর কোনো সংলাপে ফিরবে কিনা—তা নিয়ে ট্রাম্পের সহযোগীরাই গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।
তবে এ আগ্রাসনের মূল্য হতে পারে অত্যন্ত চড়া। ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ ধরনের হামলা ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি এবং সাধারণ ইরানিদের চরম দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে—অথচ এ ইরানিদেরই নিজ দেশের স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। শুক্রবার ওভাল অফিসে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে বোমাবর্ষণ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলেই কি তিনি দ্বিধাবোধ করছেন? জবাবে তিনি শুধু বলেন, আমি এ প্রশ্নের উত্তর দেব না।
তবে তার আসল দ্বিধার কারণ হতে পারে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুদ কমে যাওয়া। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এপ্রিলের এক হিসাব অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের প্রায় অর্ধেকই ততদিনে ব্যবহৃত হয়ে গিয়েছিল। চলতি মাসে টানা ১৩ রাতের হামলা ও পাল্টা হামলার পর এ মজুদ আশঙ্কাজনক স্তরে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় বড় ধরনের হামলা স্থগিত রাখার পেছনে ট্রাম্পের এটি অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন চিন্তিত যে ওয়াশিংটনের এ সামরিক ঘাটতির বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেব করতে পারেন—যা ইউক্রেন ও ইউরোপে পুতিনের জন্য এবং তাইওয়ানে শি জিনপিংয়ের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
দুই. অর্থনৈতিক অবরোধ কঠোর করা: ট্রাম্পের দ্বিতীয় বিকল্প হলো নিষেধাজ্ঞার বাঁধ আরো শক্ত করা। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনে নৌ-অবরোধ জোরালো করার মাধ্যমে ইরানের তেল রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার আশা করা।
তবে এ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। ২০১৮ সালে বারাক ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে যখন ট্রাম্প তথাকথিত 'বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা' আরোপ করেছিলেন, তখন থেকেই তিনি ইরানের অর্থনৈতিক ধসের ভবিষ্যদ্বাণী করে আসছেন। আট বছর পরও সেই শাসনব্যবস্থা টিকে রয়েছে এবং নতুন নেতৃত্বের অধীনে তারা হয়তো গোপনে পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আগের চেয়ে আরো বেশি সংকল্পবদ্ধ।
এ কৌশল দীর্ঘমেয়াদে হয়তো কাজ করতে পারে, কিন্তু তার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনকে অব্যাহত ও ব্যয়বহুল সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। এতে প্রতিনিয়ত মার্কিন সেনা ও উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলার ঝুঁকি থেকেই যায়।
তিন. নিজেকে বিজয় ঘোষণা করে সরে আসা: তৃতীয় বিকল্পটি হলো যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় দাবি করে সেনা সরিয়ে নেয়া। এক মাস আগে ট্রাম্প কিছুটা সেই পথেই হাঁটছিলেন। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ১৯৩০ সালের মার্কিন মহামন্দার জন্য দায়ী ৩১তম প্রেসিডেন্ট হারবার্ট হুভারের মতো অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি না করতেই তিনি যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার পথ বেছে নিয়েছেন।
হুভার সম্পর্কে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি কখনোই তার জায়গায় যেতে চাইনি। আমি কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাই না। পরবর্তীতে তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধ চললে বিশ্ববাজার থেকে তেলের মজুদ নিঃশেষ হয়ে যেত।
তবে এ সম্মানজনক পশ্চাদপসরণের পেছনেও রয়েছে চড়া রাজনৈতিক মূল্য। ধ্বংসস্তূপের নিচে ইরানের বোমা তৈরির উপযোগী পারমাণবিক জ্বালানি রেখে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে যদি ট্রাম্প সরে যান, তবে যে সমস্যা সমাধানের নামে তিনি সামরিক হামলা চালিয়েছিলেন, তা তো অমীমাংসিত থেকে যাবেই; উল্টো জ্বালানি বাজারে স্থায়ী নতুন সংকট সৃষ্টি হবে।
এটি হতে পারে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি ও ব্যর্থতার চূড়ান্ত দলিল। আর তা এও স্পষ্ট করেছে যে, বছরের শুরুতে তিনি উচ্চকণ্ঠে নিজের যে অপরিসীম ক্ষমতার কথা ঘোষণা করেছিলেন, বাস্তবে তার সীমা অনেকটাই সংকুচিত।